মন্দের ভালো—ওমর আলী আশরাফ

মন্দের ভালো বলে যে একটা কথা আছে, করোনা তার উদাহরণ। কী না করল এই এক ভাইরাস! অল্প কয়েকদিনে গোটা দুনিয়াকে স্থবির করে দিল! হোম কোয়ারেন্টিনের নামে মানুষকে করে দিল স্বেচ্ছা-বন্দী! এক ঝটকায় সব রাঘব-বোয়াল ঢুকে গেল খোয়াড়ে!

আপনারাও হয়তো খেয়াল করেছেন, বিনোদনের পাতায়ও এখন করোনার খবর, জুয়ার ঘরে করোনা, খেলার মাঠে করোনা, সুদের রাজ্যে করোনা, ব্যভিচারীর শ্বাসে করোনা, জালিমের গায়ে করোনা। করোনার ভয়ে নায়িকা শরীর মুড়েছে। নাচুনেরা বসে পড়েছে হাঁটুগেড়ে। থেমে গেছে নষ্টাচারের হাঁকডাক। এক করোনার আঘাতে সারা দুনিয়ায় অশ্লীলতা কমে গেছে।
‘তোমাদের ওপর যেসব বিপদ-আপদ পতিত হয়, তা তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল এবং তোমাদের অনেক অপরাধ তিনি ক্ষমা করেন।’ (সুরা শুরা, ৪২ : ৩০)

আমাকে প্রশ্ন করতে পারেন, করোনা যদি অপকর্ম রোধেই আসে, মসজিদে জামায়াত বন্ধ কেন? মুমিনেরাও কেন আক্রান্ত হচ্ছে এই মহামারিতে?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘মহামারিতে মৃত্যু হওয়া প্রত্যেক মুসলিমের জন্য শাহাদাত।’ (সহিহ বুখারি : ২৮৩০)
‘এটা হচ্ছে একটা আজাব। আল্লাহ তার বান্দাদের মধ্যে যাদের ওপর ইচ্ছে, এই আজাব ছড়িয়ে দেন। তবে, আল্লাহ মুমিনদের জন্য তা রহমতস্বরূপ করে দিয়েছেন। কোনো ব্যক্তি যদি প্লেগে (ভাইরাস) আক্রান্ত এলাকায় সাওয়াবের আশায় ধৈর্য ধরে অবস্থান করে, এবং তার অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস থাকে যে, আল্লাহ তাকদিরে যা লিখে রেখেছেন তা-ই হবে, তা হলে সে একজন শহিদের সাওয়াব পাবে।’ (সহিহ বুখারি : ৩৪৭৪)

দুর্যোগ-মহামারি দিয়ে আল্লাহ বান্দাকে বার্তা পাঠান, যেন সে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ গ্রহণ করে।

হিন্দুধর্মে কাল চারটি। সত্য, ত্রেতা, দাপর, কলি। কলি মানে এই আধুনিক যুগ। আধুনিক সভ্যতা এই যুগগুলোকে বলে প্রস্তর যুগ, লৌহযুগ, মধ্যযুগ, সভ্যযুগ।
প্রস্তর যুগ মানে মানুষ তখন সব কাজ পাথর দিয়ে করত। আগুন ধরাত পাথর ঘষে, লড়াই করত পাথর ছুঁড়ে। তারপর এল লৌহকাল। মানুষ লোহার অস্ত্র বানাচ্ছে, বাসস্থানে লোহা ব্যবহার করছে, লোহাতে নির্ভর হচ্ছে সৃষ্টি-শিল্প। তারপর এল মধ্যযুগ। মানে অনেক অগ্রসর হলেও মানুষ অশিক্ষিত আর কুসংস্কারাচ্ছন্ন রয়ে গেল। অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের বালাই নেই। কে কাকে মারে ধরে কাটে ফাঁড়ে, তার ঠিকঠিকানা নেই।
এই দিনগুলো সভ্য না এ জন্য, এগুলোতে শিক্ষার বিস্তার নেই, তথ্য সংরক্ষণের তৎপরতা নেই, আবিষ্কারের আগ্রহ নেই, সংস্কৃতিতে শিষ্টাচার নেই। মানুষ মানুষকে বেচে, যার যাকে ইচ্ছে শয্যায় নিয়ে তোলে। কিন্তু এসব থেকে উত্তরণে নির্মাণ হয়েছে সভ্যকাল। শিক্ষা আছে, শিল্প আছে, বিজ্ঞান আছে। মানুষ থাকার জন্য ঘর আছে, পরার জন্য কাপড় আছে—সব আছে। সব যেহেতু আছে, সুতরাং সভ্যই তো!

সব আছে; কিন্তু আমরা কি সব যথোপযুক্ত ব্যবহার করছি? বস্ত্র আছে বলে সভ্যযুগ। নারীরা কি ঠিকমতো বস্ত্রে আবৃত হচ্ছে? মডেল, নায়িকা, খেলোয়াড়, গাতকিনী—পোশাকের বালাই আছে? সুতরাং কীভাবে আমরা সভ্য? এই করোনার কারণে দুনিয়াটা যে কিছুদিনের জন্য সভ্য থাকছে, অশ্লীলতা কম হচ্ছে, পাপাচারে মানুষ কম দাপাচ্ছে, এ বরং আল্লাহর করুণা। মন্দের ভালো। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা।

‘তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না; নিশ্চয় তা অশ্লীলতা ও বিপথগামিতা।’ (সুরা বনি ইসরাইল, ১৭ : ৩২)
‘চোখের ব্যভিচার হলো দেখা, কানের ব্যভিচার শোনা, জিহ্বার ব্যভিচার বলা, হাতের ব্যভিচার ধরা, পায়ের ব্যভিচার হাঁটা। মন কামনা করে আর লজ্জাস্থান তা সত্য বা মিথ্যায় পরিণত করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৫৭)

© ওমর আলী আশরাফ
সিয়ান পাবলিকেশন
বিশুদ্ধ জ্ঞান〢বিশ্বমান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are makes.