এক

ছেলেটি ছিল নামকরা বিতার্কিক। গিটার বাজাতে খুব ভালোবাসত। দেশের নামকরা বিজনেস স্কুলের গর্বিত ছাত্র। মিশনারি স্কুলে পড়াশোনার সুবাদে জীবনের সফলতার যে সংজ্ঞাটা ছোটবেলা থেকে তার মনে গাঁথা সেখানে অপার্থিব কিছুর জায়গা নেই। স্বাভাবিকভাবেই ধর্মালাপে তার আগ্রহ ছিল না। নামায পড়তে বললে বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে আসত। এই ছেলেটার হাতে একদিন ড. বিলাল ফিলিপস রচিত Fundamentals of Tawheed বইটি আসে। উলটে পালটে দেখতে দেখতে পড়া শুরু করে। বইয়ে আলোচিত প্রতিটি বিষয়ই তার যুক্তিবোধে আবেদন ফেলে। সে আবেদনের প্রতিক্রিয়ায় ছেলেটির সামগ্রিক জীবনে একটি বড় পরিবর্তন আসে। গিটারের জায়গায় আসন করে নেয় আল-কুরআন। চোস্ত ইংরেজির বদলে ছেলেটির মুখে তুবড়ি ফোটে আরবির। মাল্টিন্যাশনাল কোনো এক কোম্পানির সাপ-লুডু খেলার ছকের করপোরেট মইয়ে চড়ার বদলে সে আজ গভীর রাতে উঠে ইসলাম শেখে। সাধারণ মানুষকে শেখায়। ২০১৪ সালের কথা বলছি, রূপকথা নয়। কী এতটা বদলে দিতে পারে মানুষকে?
  • আল্লাহ কে তা জানা।
  • আল্লাহ কী নন তা জানা।
  • কে আল্লাহ নয় তা জানা।
  • আল্লাহ কী চান তা জানা।
  • আল্লাহ ‘এক’ মানে কী তা জানা।
এ জ্ঞানগুলোর সংকলনকে সংক্ষেপে বলে তাওহীদ। এটাই ইসলামের মূল ভিত্তি। হাল আমলের ফরাসি দার্শনিক ঝাঁ বদ্রিলা তাঁর ‘Simulacres et Simulation বইটিতে আলাপ করেছেন সভ্যতার এক ধরণের বিবর্তনের কথা নিয়ে। এমন একটা সময় ছিল যখন আসল আর নকলের ফারাক বেশ করা যেত। শিল্প বিপ্লবের পরে একটি আসলের অনেকগুলো নকল তৈরি হলো, যেগুলো সবই দেখতে একরকম, সবই আসল নকল—একই কারখানায় তৈরি। এরপর পুঁজিবাদের বর্তমান জামানায় নকলের সম্ভার আর মিডিয়া মানুষকে ভুলিয়েই দিল আসল কাকে বলে। বিবর্তনের এই মডেলটা ইসলাম দ্বারাও স্বীকৃত। প্রতিটি মানুষ আল্লাহ যে একমাত্র ইলাহ এবং রব্‌ সে বোধ নিয়েই জন্মগ্রহণ করে। প্রতিটি সমাজও আদিতে বিশুদ্ধ থাকে চেতনায়। ধীরে ধীরে তারা নকল মা’বুদ তৈরি করে নেয় তাদের দরকারমতো। এরপর আসল উপাস্য হারিয়ে যান। সাত নকলে আসল ভেস্তা তো হবেই। নকল মা’বুদের দরকার কী? আল্লাহ যে বিবেক দিয়েছেন তাকে সাত-পাঁচ বুঝিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়া। মানুষ যখন জানতে শুরু করে তখন বিবেক জাগতে শুরু করে। এক স্রষ্টার এককত্বের জ্ঞান মানুষের ভাবনার জগতে এক প্রবল ধাক্কা দেয়। আল্লাহর ইবাদাহ যে মানুষের নিছক কর্তব্য নয়, বরং জীবনের সবচেয়ে বড় কর্তব্য এটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। পৃথিবীতে আসার উদ্দেশ্য যে ইবাদাতে এক আল্লাহর এককত্ব প্রতিষ্ঠা করা এটা বোঝার পর অধুনা আমাদের যাপিত জীবন অর্থহীন মনে হবে। এতদিন করে আসা সব কিছু কি তবে মিথ্যা? তাওহীদকে বাদ দিয়ে ছোটবেলা থেকে শেখা এত সব নীতিকথাকে চটুল মনে হতে থাকে। সাথে থাকে আক্ষেপের অন্তর্দহন—এত দিন কেন জানিনি? কেন শিখিনি? কেন চিন্তা করিনি? হৃদয়ের রুদ্ধ অর্গল খোলার নিমিত্তে এই বই। অপরের বিবেকের দোরে করাঘাত করার নিমিত্তে এ বই। আমাদের এ বইটি ড. আবু আমীনাহ বিলাল ফিলিপস রচিত Fundamentals of Tawheed এর চতুর্থ বাংলা অনুবাদ। সম্ভবত, আল কুর’আনের পরে কোন ভিনভাষার বইয়ের এতগুলো অনুবাদ বেরোয়নি। পূর্বের অনুবাদগুলোতে বিয়োজন-সংযোজন ছিল যার জন্য ড. বিলাল ফিলিপসের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। মূল লেখককে দেওয়া হয়নি তার প্রাপ্য সম্মানী। বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতের খুব সাধারণ চিত্র হলেও এমনতর অনৈতিকতা প্রকাশনী সংস্থার বিশ্বমান অর্জন ব্যাহত করে। আর ইসলাম প্রচারকল্পে অনৈতিকতা প্রচারকারীর বিশস্ততায় আঘাত করে। আমরা দুটোর একটাও চাই না বিধায় চতুর্থ অনুবাদটি আমাদের আনতে হয়েছে। আশা করি এ বইটি পড়ে সিয়ানের অনুবাদের গুণগত পার্থক্যটি পাঠকদের কাছে স্পষ্ট হবে। তাওহীদের উপর সারা পৃথিবীতে প্রচুর বই আছে। এর অধিকাংশই আরবিতে লেখা। কিন্তু ড. বিলাল ফিলিপস এর বহুজাতিক এবং বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা এই বইটিতে এমন কিছু দৃষ্টিভংগি যোগ করেছে যা আরব বিশ্বের অনেক বড় স্কলারদের কাজেও দেখা যায় না। তুলনামূলক ধর্মতত্ব, সংষ্কৃতি এবং কৃষ্টির অন্তর্ভুক্তির কারণে এই বইটি অনন্য। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, মানুষ ঘুমাচ্ছে; যখন তাদের মৃত্যু হবে তখনই তারা জাগবে। আমরা মানুষকে মৃত্যুর আগেই বাস্তবতাতে নিয়ে আসতে চাই। ‘এক’ বইটি তার জন্য একটি প্রয়াস। মানুষের মাঝে আল্লাহর এককত্বের বার্তাটি আমরা পৌছে দিতে চাই। এই প্রয়াসে সবাইকে স্বাগতম।
মূল: শরীফ আবু হায়াত অপু সৌজন্যে: সিয়ান পাবলিকেশন