সস্তার তিন অবস্থা

ইমাম ইবন হাজার আসকালানীর সেই বিখ্যাত ঘটনাটি হয়তো আমরা অনেকেই জানি। তিনি তখন মিশরের প্রধান বিচারপতি। রাজকীয় শান শাওকাতের সাথে কোথাও যাচ্ছিলেন। এক ইহুদি তেল বিক্রেতা তাকে দেখে বলল, আপনাদের নাবি নাকি বলেছেন, “দুনিয়া কাফিরদের জন্য জান্নাত আর মু’মিনদের জন্য জেলখানা কিন্তু দেখেন আপনি কেমন জীবন যাপন করছেন, আর আমার কী দুরাবস্থা!” ইবন হাজার তখন বলেন, “নাবি সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঠিকই বলেছেন, ইনশা আল্লাহ আমি জান্নাতে যে অবস্থায় থাকব তার তুলনায় আমার বর্তমান অবস্থা আসলে জেলখানা সমতুল্যই; আর তুমি (কাফির অবস্থায় মারা গেলে) জাহান্নামে যে পরিণতি হবে সে তুলনায় এখন জান্নাতেই আছো!” আসলে সমাজে ভালো কাজকে, ভালো মানুষকে যতো বেশি সম্মান করা হবে, মর্যাদা দেওয়া হবে সমাজ তত ভালো হবে। ভালো কাজ বাড়বে, ভালো মানুষ বাড়বে। যে সমাজ গুণীজনের সম্মান করে না সে সমাজে গুণীজন জন্মায় না। আর এই সম্মাননার প্রতীকি যেমন কিছু রূপ রয়েছে তেমনি রয়েছে ফলিত কিছু দিক। আর্থিক দিক থেকে গুণীজনদেরকে স্বচ্ছল অবস্থানে রাখার চেষ্টা করাটা এর অন্যতম একটি দিক। মানুষ যদি ভালো মানুষদেরকে দরিদ্র-পীড়িত, নিগৃহিত অবস্থায় দেখে তাহলে স্বভাবতই তাদের মতো হওয়ার কথা তারা ঘুণাক্ষরেও চিন্তা করবে না। হ্যাঁ, স্বচ্ছল বলতে আমি দুর্নীতি করে টাকার কুমির হওয়া বোঝাচ্ছি না; সম্মানজনক জীবনযাপন বোঝাচ্ছি। আর বৈধভাবে গুণীজনেরা যদি বিত্তশালী হয় তাতে সমাজ লাভবানই হবে। একারণেই আমরা দেখতে পাই মুসলমানদের ইতিহাসে লেখক অনুবাদকদেরকে তাদের পাণ্ডুলিপির সমপরিমাণ ওজনে স্বর্নমুদ্রা দেওয়ার উদাহরণও আছে। আর্থিক অস্বচ্ছলতা মানেই লাঞ্ছনা নয়। তবে অসচ্ছলতা ও দারিদ্রতা যদি সমাজের বিশেষ কোনো শ্রেণির সাধারণ বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায় তাহলে তা নির্ঘাৎ তাদের জন্য অপমানজনক এবং এটা আল্লাহর তরফ থেকে যিল্লাত। আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে অনেক স্থানে তার আনুগত্যের সাথে স্বচ্ছলতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পক্ষান্তরে আল্লাহর অবাধ্যচারিতার কারণে ইহুদীদের উপর অভিশম্পাত দিয়ে বলেছেন, “তাদের উপর লাঞ্ছনা ও দারিদ্রতাকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তারা আল্লাহর ক্রোধভাজন হয়ে পড়ল। কেননা তারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করছিল এবং অন্যায়ভাবে নাবিদের হত্যা করছিল। এটা একারণেই যে, তারা অবাধ্যচারিতা করেছিল এবং সীমালঙ্ঘন করেছিল।” (আল-বাক়ারাহ, ২:৬১) “যে জাতি জ্ঞানীদের সম্মান করে না সে জাতির মধ্যে গুণীজন জন্মায় না”—একথাটি আমরা সবাই জানি। কিন্তু গুণীজনের সম্মান বলতে কী বুঝায়? নিছক তাদের দেখে লম্বা করে সালাম দেওয়া, উঠে দাঁড়ানো? না। তাদের সম্মানজনক আর্থিক ও সামাজিক অবস্থান নিশ্চিত করাটা এর অন্যতম ফলিত রূপ। এই জ্ঞানী-গুণীজনেরাই সাধারণত ইসলামি শিক্ষা-দীক্ষা, দান, জ্ঞান-গবেষণা, শিল্প-সাহিত্য, বই-পুস্তক রচনার কাজে নিয়োজিত থাকেন। তাই তাদের অবদানকে সম্মান করা, মুল্যায়ন করা ‘ইল্‌ম ও ‘আলিমদের সামাজিক ক্ষমতায়নের একটি অংশ; যার সুফল শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণই ভোগ করে। কিন্তু আমি যখন দেখি আমাদের দীনি ভাইয়েরা কেবল সস্তা বই খোঁজেন, বইয়ের দামটা একটু বাড়লেই গাই-গুই শুরু করেন, এন্তার অভিযোগ দায়ের করতে শুরু করেন—বেশ হতাশ হই। বই-পুস্তককে আমরা যারা কাগজ-কালি-মলাটের সমন্বয়ে তৈরি করা নিছক একটি পণ্য ভাবি তখন আমরা সত্যিই বড় ভুল করি, বড় অন্যায় করি। বই-পুস্তককে জামা-জুতো-ঘড়ির মতো পণ্য ভাবাটা নির্মম রসিকতা। এ অন্যায় আদর্শের প্রতি, মূল্যবোধের প্রতি, জ্ঞানের প্রতি। দু শ টাকার একটি বই যদি আপনাকে জাহান্নামের পথ থেকে জান্নাতের পথের দিশা দেয় তাহলে তার দাম কত? দাম্পত্য জীবনের সুখপাখিটিকে হারানো একজন মানুষ যখন এক শ টাকা দিয়ে একটি বই কেনার কারণে সেটিকে আবার ফিরে পান তখন তা কি টাকার পরিমাণ দিয়ে মুল্যায়ন করা যায়? অতএব, বই কেনার সময় মূল্য নয় মূল্যবোধের কথা ভাবুন। এদেশে ইসলামি বই-পুস্তক যারা সস্তায় কিনে অভ্যস্ত এবং আরও সস্তায় কামনা করেন আমার সেইসব প্রাণপ্রিয় ভাই-বোনদের কাছে এই সস্তা-সংস্কৃতির পর্দার পেছনে কিছু চিত্র তুলে ধরতে চাই। বাংলাবাজার কেন্দ্রিক ইসলামি পাবলিশিং হাউজের পর্দার পেছনের জগতে অতি পরিচিত একজন ব্যক্তি আর আমি এক সময় এক সাথে কাজ করতাম। আমার অনেক সিনিয়র; কিন্তু বন্ধুর মতো মন খুলে মিশতেন। অত্যন্ত সরল, সৎ ও সাদামাটা জীবনযাপন করেন। বেশ ভালো মানের একজন গবেষক, লেখক, সংকলক ও অনুবাদক। ভদ্রলোক চলাফেরা করেন একেবারেই সাধারণ মানের লুঙ্গি পাঞ্জাবি পড়ে। বলতেন, “পাজামার মধ্যে তোমরা ঢোকো কীভাবে? আমার তো দম বন্ধ হয়ে আসে।” অন্তত শ খানেক বই তার হাত দিয়ে বেরিয়েছে। কিন্তু আমি দেখেছি, তিনি বাংলা বাজার থেকে মগবাজার হেঁটে এসেছেন—সামান্য কটাকা ভাড়া না থাকার কারণে। আত্মসম্মানবোধের কারণে গাড়িতে উঠে ‘ভাড়া নেই’ বলে নিজেকে ছোট করতে চাননি। এই লেখাটি যারা পড়ছেন কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ব্যবহার করার সামর্থ্য যেহেতু তাদের আছে, আপনাদের অনেকের কাছেই হয়তো ব্যাপারটিকে অবাস্তব মনে হতে পারে। কিন্তু না, অবাস্তব নয়। এটিই তিক্ত-রুক্ষ এক নির্মম বাস্তবতা। আমি কারও বর্ণনাসূত্রে এ ঘটনা শুনিনি, আমি এর প্রত্যক্ষদর্শী। লেখক, অনুবাদক সংকলকদের নাম না দিয়ে নিজের ও নিজের স্ত্রী-পুত্রদের নামে বই ছাপার ঘটনাও এদেশে অহরহ ঘটে। প্রকাশক যেখানে প্রকাশকের কথাটুকুও লেখার যোগ্যতা রাখেন না সেখানে তিনিই অনেক সময় হয়ে যান বিখ্যাত লেখক। এজন্য আমার সেই বন্ধু ‘প্রকাশক’ না বলে ‘প্রতারক’ বলতেন; ‘প্রকাশনা’কে বলতেন ‘প্রতারণা’। এমন একজন নয় আরও অনেককে দেখেছি। ঘনিষ্ঠভাবে দেখা এমন আরও একজন বন্ধু আছেন আমার। তিনি উর্দু অনুবাদক। এতো ঝরঝরে অনুবাদ করেন যে পড়লে মনেই হয় না অনুবাদ। দেশের খ্যাতনামা লোকেরা তার অনুবাদ দেখে বলেন, এ যেন কাশ্মিরি শালের এপিঠ-ওপিঠ; বোঝাই যায় না—অনুবাদ না মৌলিক লেখা। আপনাদের অনেকের না-ও জানা থাকতে পারে—এদেশের অনুদিত ইসলামি বইয়ের একটা বৃহৎ অংশ উর্দু থেকে অনুবাদ হয়ে থাকে। বিশাল বিশাল সাইজের শ এর উপর বই অনুবাদ করেছেন, কিন্তু স্বীকৃতি পেয়েছেন খুব কমই। তা-ও যদি ঠিকমতো পারিশ্রমিকটা পেতেন হয়তো কষ্ট ভুলতে পারতেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশনে ভালো পদে চাকরি করতেন তিনি, হয়তো তাই হেঁটে ঢাকা আসতে হয়নি তাকে। কিন্তু পাবলিশারদের দুয়ারে দুয়ারে হাঁটতে হাঁটতে জুতো ক্ষয় করেছেন অনেক। অনেক দুঃখ নিয়ে একদিন বলেছিলেন, ‘ভাই আমরা কি ভিক্ষুক? পারিশ্রমিকের জন্য গেলে ওরা ভিক্ষুকের মতো আচরণ করে। পাচ শ, এক হাজার টাকা দিয়েও বিদেয় করার চেষ্টা করে; অথচ আমার তাতে আসা যাওয়ার খরচও হয় না।’ তার কথাটা আমি হজম করতে পারিনি; একটা শক্ত পাষাণের মতো মনের তলায় পড়ে আছে আজও। ইসলামি বইয়ের সস্তা-সংস্কৃতির যে ভিত্তি, তার অনেকাংশ গড়ে উঠেছে এভাবে জ্ঞানী-গুণী, ‘আলিমদের উপর অবিচারের উপর ভিত্তি করে। এদের দারিদ্রতা হলো এই সংস্কৃতিক ইমারতের সিমেন্ট, আর অভিশাপ হলো ইট। আমি ব্যক্তিগতভাবে একটা সময়ে এদেশের প্রথম সারির একটি প্রকাশনা সংস্থার গবেষণা বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। প্রচুর সম্মান পেলেও চলতে হয়েছে নিজের ব্যবসায়িক উপার্জন দিয়ে। আল্লাহর দয়া যে তিনি আমাকে এই প্রশস্ততা দান করেছেন। কিন্তু আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি, এদেশের ইসলামি প্রকাশনার সাথে যারা জড়িত আছেন তাদের কেউই সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারেন না, যদি তাদের অন্য কোনো ব্যবস্থা না থাকে; কিংবা যদি অন্যায় পথ অবলম্বন না করেন। হ্যাঁ, হাতেগোণা কজন বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ আর কিছু প্রকাশনা মালিকদের কথা ভিন্ন। আমারও ইচ্ছে ছিল নিজে প্রকাশনার দিকে যাবো। কিন্তু আমার সেই পরিমাণ আর্থিক সামর্থ্য ছিল না। সেক্ষেত্রে করতে হলে আমাকেও অন্যদের মতো অভিশাপ কুড়োতে হতো। তাই আর এ পথে পা বাড়াইনি। ওখান থেকে ইস্তফা দেওয়ার পর অনেক বন্ধুরা অনুরোধ করেছিলেন লেখালেখিকে পেশা হিসেবে নিতে। কিন্তু আমি আঁৎকে উঠেছিলাম এ পেশায় নিয়োজিতদের অবস্থা দেখে। আমি ব্যবসায় বেশি সময় দেওয়া শুরু করলাম জীবিকার জন্য। আল্লাহ বারাকাহ দিয়েছেন—আল-হ়ামদু লিল্লাহ। এই সস্তা সংস্কৃতির আরেকটি দিক রয়েছে। একটি বই একজন মানুষের ব্যক্তিগত বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম সাধনার ফসল। এর মাধ্যমে অর্থ উপার্জন একজন লেখক গবেষকের জন্য সম্পূর্ণ হালাল; যদি তিনি লেখার ক্ষেত্রে দীনি ‘ইলমের আমানাত সততার সাথে রক্ষায় সচেষ্ট হয়ে থাকেন। একটি বই যদি অন্য কোনো ভাষায় অনুবাদ করতে হয় তাহলে মূল লেখক জীবিত থাকলে তার কাছ থেকে যেমন অনুমতি নেওয়া উচিত, তেমনি অনুদিত বই বিক্রি থেকে রয়ালিটি পাওয়ার ন্যায্য অধিকারও তিনি কিংবা তার উত্তরাধিকাররা রাখেন। কিন্তু আমাদের এই বঙ্গদেশে নীতি-নৈতিকতার এই ব্যাকরণ অচল। এখানে কেউ মূল লেখকের সাথে যোগাযোগেরই ধার ধারেন না; রয়ালিটি দেওয়া তো দূরের কথা। এই বে-ইনসাফির উপরই দাঁড়িয়ে আছে আমাদের বাংলা ভাষার ইসলামি প্রকাশনার জগৎ। এই হলো ইসলামি বইয়ের সস্তা সংস্কৃতির একটি দিক। আরেকদিন কথা কথা হবে দীনি ‘ইলমের উপর এ জগতের অবিচারের ফিরিস্তি নিয়ে। সেদিন পর্যন্ত ভালো থাকুন।
মূল: আহমদ রফিক সৌজন্যে: সিয়ান পাবলিকেশন

One thought on “সস্তার তিন অবস্থা

  1. Mohammad Miraj Uddin Ahmed Sayem says:

    আলহামদুলিল্লাহ্‌ আল্লাহ আপনাদের এই উদ্দোক কে আরো প্রসারিত করে দিক আমীন।।।

Comments are closed.